প্রকাশিত: 2:12 AM, October 24, 2026


মাদক নিয়ে চলছে চালবাজি, চুনোপুঁটি আটক: রহস্যজনক ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা?

​বিশেষ প্রতিনিধি:
রাজধানীর মুগদা থানা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদকের বিস্তার ও কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তৎপরতা চললেও কার্যকর কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসব অবৈধ কারবারের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের একটি অংশ জড়িত থাকায় মূল হোতারা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিক্ষিপ্ত অভিযানে কেবল কিছু মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতা আটক হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই তারা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ​মুগদা থানার অন্তর্গত বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশ কয়েকটি পয়েন্টে মাদক কারবার সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—মানিকনগর, মুগদা স্টেডিয়াম এলাকা, মুগদা ঝিলপাড়, মদিনাবাগ ময়লার ডাস্টবিন এলাকা, দক্ষিণ মুগদা রাজার গলি, মান্ডা সুখনগর, জামাইর টেক, মান্ডা ঝিলপাড়, পিয়ারআলী গলি, প্রথম গলি এবং ল্যাটকা ফকিরের গলি। এছাড়া মানিকনগর বিশ্বরোড, কুমিল্লা পট্টি আনন্দধারা, প্রেমগলি, মিজান গলি, ওয়াসা রোড, পূর্ব মানিকনগর নতুন পাকার মাথা ও ঠেলাওয়ালা গলিসহ অলিগলিতে নিয়মিত মাদক কেনাবেচা চলছে।

​এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা চললেও সরবরাহকারী ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। অভিযানে কেবল চুনোপুঁটিদের আটক করে আইনি প্রক্রিয়া সারানো হলেও সমস্যার মূল উৎপাটন সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে স্থানীয় এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “পুলিশ মাঝে মাঝে খুচরা আসামিদের ধরে ঠিকই, কিন্তু ২-৩ দিন পরেই তারা জামিনে বের হয়ে আসে। থানা এলাকার ভেতরেই এই কারবার দিনরাত চলছে, অথচ নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদের টিকিও ছোঁয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে গত ৫ আগস্টের পর এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের সাম্রাজ্য আরও মজবুত করেছে। অবৈধ মাদকের টাকায় অনেকেই চার-পাঁচ তলা একাধিক বাড়ির মালিক বনে গেছে।”​পরিস্থিতির ভয়াবহতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সমাজসেবক ও সাধারণ অভিভাবকবৃন্দ।

তাঁদের মতে, মাদকের এই নীল ছোবল ও কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্যে এলাকার সন্তান ও যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তাঁরা আতঙ্কিত না হয়ে নিজেদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশ দাবি জানান। একইসাথে, সংঘাতের পথ ছেড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মুগদাবাসী। জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ সমন্বয়ে দ্রুত জোরালো পদক্ষেপের আশা করছেন তাঁরা।

​মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানতে গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছেন অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা। ড. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “মাদক নির্মূল করতে হলে কেবল প্রান্তিক পর্যায়ের মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতাদের ধরপাকড় করে কোনো লাভ হবে না। রাঘববোয়াল বা সিন্ডিকেটের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলে অপরাধের সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত হয়। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।”

​ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে যুব শক্তি সামাজিক আন্দোলন বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী মোঃ রাসেল সরকার বলেন, “অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বারবার মুগদার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মাদকের বিস্তারের চিত্র উঠে এলেও শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের রহস্যজনক নীরবতা অত্যন্ত হতাশাজনক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য আমলে নিয়ে যদি এখনই কার্যকর অভিযান না চালানো হয়, তবে আমাদের যুবসমাজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।” ​তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা ‘যুব শক্তি সামাজিক আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সবসময় জোরালো ভূমিকা রাখছি এবং সাংগঠনিক বিবৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি। কিন্তু আফসোসের বিষয়, কোন কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। প্রকৃত রহস্য কোথায়, তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।” ​

একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই এখন মুগদাবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।

উল্লেখ: মাদক নিয়ে চলছে চালবাজি, ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে আসছে পরিপূর্ণ আপডেট।