প্রকাশিত: 6:01 AM, August 29, 2026


বিচারহীনতা ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য: অপরাধের লাগাম টানতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর?

বিশেষ প্রতিবেদক,
​ঢাকা: সারা দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে খুনাখুনি। রাজনৈতিক কোন্দল, দখল, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্যের লড়াই এবং পারিবারিক-সামাজিক কলহের জেরে গত সাত মাসে (জানুয়ারি থেকে জুলাই) সারা দেশে মোট ২ হাজার ৭৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

​পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ২৮৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাই মাসে ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। কেবল জুলাই মাসেই ২৯৮টি খুনের ঘটনার মধ্যে গণপিটুনিতে ২১ জন এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে ২০২৫ সালের জুন ও জুলাই মাসে যথাক্রমে ৩৪৪ ও ৩৬২টি খুনের ঘটনা ঘটেছিল।

​বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিনে মুক্তি পাওয়া এবং বিদেশ থেকে অনেকের নতুন করে সক্রিয় হওয়ার ঘটনা অপরাধ পরিস্থিতির অবনতিতে ভূমিকা রেখেছে। বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দেশে থাকা অনুগতদের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর সঙ্গে সংঘাতে লড়ছে, ফলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংঘাত এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।

​এছাড়া, বছরের শুরুতে রাজনৈতিক মেরূকরণের পর রাজনৈতিক সহিংসতাও বেড়েছে। গত সাত মাসে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে সারা দেশে ৭৫ জন নিহত হয়েছেন, যার বড় একটি অংশ বিরোধী দল ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী। এর পাশাপাশি পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, আর্থিক লেনদেন এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও খুনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

​পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পুলিশ সদর দপ্তর মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৫ আগস্টের পর থানার কার্যক্রম ও টহল ব্যবস্থা কিছুটা ব্যাহত হলেও বর্তমানে তা জোরদার করা হয়েছে। আইজিপি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

​তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন থানা ও ব্যারাক থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ—যার মধ্যে ১ হাজার ৩১১টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি—সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব এসএমজি, চায়না রাইফেল ও পিস্তল উদ্ধার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক মনে করেন, বিচারহীনতা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে শিথিলতা থাকলে অপরাধীরা সেই সুযোগ নেয়। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

​পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহদাত হোসাইন জানান, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের দমনে পুলিশ সর্বাত্মক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।