সাবিয়া ইসলাম সাবিয়া ইসলাম
রিপোর্টার
টপ পে’এর কিস্তি পরিশোধের পরও ফোন ‘লক’ চরম বিপাকে গ্রাহক;নির্দিষ্ট পেশার গ্রাহকদের কিস্তি সুবিধা নিয়ে তীব্র বিতর্ক


মোঃ রাসেল সরকার-ঢাকা:
বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড ছাড়াই স্মার্টফোন কেনার জনপ্রিয় কার্ডলেস ইএমআই (EMI) প্ল্যাটফর্ম ‘টপ পে’ (TOPPAY Services Limited)-এর বিরুদ্ধে গ্রাহক সেবায় চরম গাফিলতি ও আর্থিক হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে অপ্পো (OPPO), রিয়েলমি (realme) এবং ওয়ানপ্লাস (OnePlus) ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেটগুলো কিস্তিতে কেনার পর ব্যবহারকারীরা নানা ধরনের কারিগরি ও আর্থিক জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
টপ পে অ্যাপের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকলেও বহু গ্রাহক অভিযোগ করেছেন যে, বিকাশ বা নির্ধারিত মাধ্যমে সঠিক সময়ে কিস্তির টাকা কেটে নেওয়ার পরও তাদের হ্যান্ডসেটগুলো আনলক হচ্ছে না। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত অর্থ পরিশোধের সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে (অফিস চলাকালীন) ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সচল হওয়ার কথা থাকলেও অনেক গ্রাহকের হ্যান্ডসেট দিনের পর দিন লক অবস্থাতেই থাকছে।
এক ভুক্তভোগী তরুণ ফ্রিল্যান্সার নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “আমি বিকাশের মাধ্যমে নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ করেছি। কিন্তু তিন দিন পার হয়ে গেলেও আমার রিয়েলমি ফোনটি লক হয়ে আছে। ফোন বন্ধ থাকায় আমার জরুরি পেশাগত কাজ ও যোগাযোগ সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে।” গ্রাহকদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো—ব্যাংকিং বা কারিগরি ত্রুটির কারণে পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় সামান্য বিলম্ব হলে কিংবা অ্যাপে পেমেন্ট আপডেট না হলে গ্রাহকদের ওপর অন্যায্য বিলম্ব ফি বা পেনাল্টি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কিস্তির মূল অঙ্কের চেয়েও অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
টপ পে-র ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে অসংখ্য গ্রাহক অভিযোগ করেছেন যে, অ্যাপে কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে বা ভুলবশত অ্যাপ আনইনস্টল হয়ে গেলে কিস্তি পরিশোধের কোনো সহজ বিকল্প পথ থাকে না। পাশাপাশি, কোম্পানির অফিসিয়াল হটলাইন নম্বরে (০৯৬৭৭-৬৮৮৬৮৮) কল করেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধির সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
যদিও প্রতিষ্ঠানটি তাদের অফিসিয়াল পেজে গ্রাহকদের সতর্ক করে জানিয়েছে যে, অফিশিয়াল অ্যাপ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিগত নম্বরে কিস্তির টাকা লেনদেন করলে জালিয়াতির ঝুঁকি থাকে; তবে গ্রাহকদের পালটা দাবি—অফিসিয়াল অ্যাপের ত্রুটি এবং কাস্টমার কেয়ারের চরম অসহযোগিতাই মূলত তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কারিগরি ত্রুটি ও গ্রাহক হয়রানির দ্রুত সমাধান করা না হলে উদীয়মান ডিজিটাল ফাইন্যান্স ও কার্ডলেস ইএমআই সেবার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
এদিকে, টপ পে-র একটি বিশেষ ব্যবসায়িক পলিসি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি সাংবাদিক, আইনজীবী এবং পুলিশ সদস্যদের জন্য সহজ শর্তে কিস্তিতে (EMI) মোবাইল ফোন ক্রয়ের বিশেষ সুবিধা প্রদান করে আসছে। তবে সাধারণ গ্রাহক ও ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ এই নীতিমালার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অ্যাপের কারিগরি ত্রুটি ও হয়রানির শিকার হওয়া একাধিক গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন—“যারা প্রভাবশালী পেশার মানুষকে বিশেষ সুবিধায় ফোন দিচ্ছে, তারাই আবার সাধারণ গ্রাহকদের টাকা আটকে রেখে ভোগান্তি তৈরি করছে।”
ভুক্তভোগীদের দাবি, সাধারণ মানুষ কিস্তির টাকা পরিশোধ করার পরও যখন ফোন সচল করতে পারছে না বা অতিরিক্ত ফি দিতে বাধ্য হচ্ছে, তখন বিশেষ পেশার মানুষদের এই সুবিধা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এক ধরনের ‘সুরক্ষা বলয়’ তৈরি করতে চাইছে কি না—তা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থাকে পুঁজি করে এই ধরনের কারিগরি জটিলতা ও হয়রানিমূলক পরিস্থিতিকে অনেকেই এক ধরনের ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

