সাবিয়া ইসলাম সাবিয়া ইসলাম
রিপোর্টার
ডেমরা ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি জয়নালের নেতৃত্বে চাঁদাবাজি ও তাণ্ডব: নেপথ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৬৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হাজী জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার হুমকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, চাঁদা না দেওয়ায় মধ্য বক্সনগরের বাসিন্দা মো. স্বপন রাজ নামের এক ব্যক্তিকে তিনি বেধড়ক মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে হাজী জয়নাল আবেদীন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছেন। সম্প্রতি তিনি মধ্য বক্সনগরের বাসিন্দা মো. স্বপন রাজের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। স্বপন রাজ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, জয়নাল আবেদীন ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং তাঁকে শারীরিকভাবে মারাত্মকভাবে লাঞ্ছিত করে। পরবর্তীতে প্রকাশ্যেই তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এতে ভুক্তভোগী স্বপন রাজ ও এলাকার সচেতন নাগরিকেরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী মাসুদের সহযোগীর এমন কর্মকাণ্ডে পুরো মধ্য বক্সনগর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ডেমরায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক ও একই ফ্রেমে বন্দি হওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ডেমরা ৬৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হাজী জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে।
নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে গোপন বৈঠক, রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং এলাকায় চাঁদাবাজির একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ডেমরা থানার নিষিদ্ধ ঘোষিত কৃষক লীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন এবং ৬৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির হোসেনের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন হাজী জয়নাল আবেদীন। ডেমরায় নিষিদ্ধ ঘোষিত কৃষক লীগের কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের জমজমাট আড্ডায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।
নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা যখনই কোনো গোপন সভা বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা করেন, তখন তাঁদের পাহারা দিয়ে বা সরাসরি সুরক্ষা দিয়ে নিরাপদ রাখছেন এই বিএনপি নেতা। ক্ষমতার বলয় ও নিজস্ব স্বার্থ বজায় রাখতে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সঙ্গে তাঁর এই গোপন আঁতাত এখন ডেমরা এলাকার ‘টক অব দ্য টাউনে’ পরিণত হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারের দোসররা কোণঠাসা হলেও ডেমরার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৫ আগস্টের পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এই গুপ্তবাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করেই এলাকায় চাঁদাবাজি ও অপরাধের রাজত্ব কায়েম করেছেন জয়নাল আবেদীন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাঁর ভয়ংকর রূপ উন্মোচিত হয়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যবসায়ীকে চাঁদা না দেওয়ায় তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে ঢুকে নির্মম হামলা ও তাণ্ডব চালান এই অপরাধ চক্রের মূল হোতা জয়নাল আবেদীন ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নানা সমঝোতা, আঁতাত ও ছক কষে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পুরো আমল দিব্যি পার করেছিলেন এই হাজী জয়নাল আবেদীন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর খোলস পাল্টে তিনি এখন বিএনপি পরিচয়ে একই কায়দায় অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, যাঁরা দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে নির্যাতন সহ্য করে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, আজ তাঁদের সুনাম নষ্ট করছেন এই সুবিধাবাদীরা। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গুপ্তবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এলাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। তাঁকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দল থেকে বহিষ্কার করা না হলে ভবিষ্যতে ডেমরায় এটি আরও ভয়ংকর নিরাপত্তার সংকট তৈরি করবে।”
এ বিষয়ে আইন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে গোপন আঁতাত বজায় রাখে, তারা মূলত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। ৫ আগস্টের পর এক শ্রেণির সুবিধাবাদী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করছে। এ ধরনের অপরাধীদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে আইনের শাসন নিশ্চিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থেকে কেউ যদি দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তবে দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও কঠোর বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। ডেমরার সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের জোর দাবি, অনতিবিলম্বে এই গুপ্ত চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। চলবে…
(বিস্তারিত আসছে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে।)

