সাবিয়া ইসলাম সাবিয়া ইসলাম
রিপোর্টার
বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং প্রকল্পে নজিরবিহীন লুটপাট: নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির সাম্রাজ্য
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:
দেশের নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং নৌপথ সচল রাখার গুরুদায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, সেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগ এখন দুর্নীতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। নদী খননের নামে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না। ড্রেজিং প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই চলে যাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের পকেটে, যার নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মো. মামুন উর রশিদ। বিগত সরকারের প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে গভীর সখ্যতা থাকায় তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
বিশেষ করে ভোলা, লাহারহাট, বরগুনা, আমতলী, পটুয়াখালী এবং বরিশাল সদর নৌ-পথে ড্রেজিংয়ের নামে নজিরবিহীন অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। অনুসন্ধানে ড্রেজিং বিভাগে দুর্নীতির কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্র চিহ্নিত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী একটি ড্রেজার দিনে কত ঘণ্টা চলল এবং কতটুকু মাটি খনন করল তার সুনির্দিষ্ট লগবই থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে ড্রেজার বন্ধ রেখেও ভুয়া লগবইয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার ডিজেল চুরির হিসাব দেখানো হতো। নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের প্রত্যক্ষ আসকারায় এই সিন্ডিকেট দীর্ঘকাল ধরে সক্রিয় রয়েছে।
খননকৃত বালু বা পলিমাটি নদীর পাড় থেকে অন্তত ৫০০ মিটার দূরে ফেলার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মাঝ নদীতেই ফেলা হতো। কারিগরি তদারকির অভাবে জোয়ারের টানে সেই মাটি পুনরায় খননকৃত স্থানেই ফিরে আসত, যা একই স্থানে বারবার ড্রেজিং দেখিয়ে বিল উত্তোলনের একটি অন্তহীন সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব ড্রেজার বহর থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে সরকারি ড্রেজার সামান্য ত্রুটির অজুহাতে বছরের পর বছর অচল করে রাখা হতো। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া করার পথ সুগম করা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের অলিখিত কমিশন চুক্তি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি ড্রেজার বাস্তবে কাজ না করলেও ভুয়া ‘কিউবিক মিটার’ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল পাস করিয়ে নেওয়া হতো। কোটি কোটি টাকা মূল্যের নিজস্ব ড্রেজারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জং ধরলেও মেরামতের নামে প্রতিবছর বরাদ্দ করা বিপুল অর্থ ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হতো। নতুন যন্ত্রাংশ না কিনে পুরনো যন্ত্রাংশ রং করে চালানো কিংবা সম্পূর্ণ ভুয়া বিলের মাধ্যমে টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ড্রেজিং বিভাগের ভাণ্ডারে থাকা মূল্যবান তামা, পিতল ও ভারী যন্ত্রাংশ পাচারের ঘটনাও ঘটেছে।
বিগত আওয়ামী সরকারের শাসনামলে বরিশালের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শীর্ষ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় মামুন উর রশিদ বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে ও বাইরে একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার করতেন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাপটের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। কোনো কর্মকর্তা বা সাধারণ মানুষ অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাঁদের দুর্গম এলাকায় বদলি বা চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো হতো। নিজের অপকর্ম ঢাকতে এবং হুমকি-ধমকিকে বৈধতা দিতে তিনি টাকার বিনিময়ে একটি অনুগত চক্র ব্যবহার করতেন, যারা মাঠপর্যায়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহকারীদের ভয়ভীতি দেখাত। ড্রেজিং বিভাগের একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখানে দুর্নীতির একটি সুশৃঙ্খল চেইন রয়েছে। জ্বালানি চুরির টাকা নিচ থেকে শুরু করে ওপরের মহলের দপ্তর পর্যন্ত বণ্টিত হতো।
দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ হলে মামুন উর রশিদ চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি সংবাদ ডিলিট করতে বাধ্য করা এবং প্রাণনাশের হুমকি দিতেন। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া সাংবাদিক ও প্রতিবাদী ব্যক্তিদের কণ্ঠ রোধ করতে তিনি একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করে চরম হয়রানি করেন। এর অংশ হিসেবে তিনি ঢাকার মতিঝিল থানায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও দায়ের করেছিলেন। ইতিপূর্বে সাংবাদিকদের হয়রানির জন্য দায়ের করা মিথ্যা মামলার নথিপত্র এবং সংবাদ প্রত্যাহারের প্রমাণগুলো বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও দুদকের অনুসন্ধানে প্রধান প্রমাণ হিসেবে সংযুক্ত করা হচ্ছে। নদী খনন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে মামুন উর রশিদ অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। ঢাকার রামপুরা, আফতাবনগরসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তাঁর নামে-বেনামে বহুতল ভবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। সরকারি বেতন কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যহীনভাবে এই বিশাল ইমারতগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।
তদন্ত এড়াতে এবং দুর্নীতির প্রমাণ লুকাতে তিনি রামপুরা ও মেরুল বাড্ডা এলাকার বেশ কিছু স্থাবর সম্পত্তি নিকটাত্মীয় এবং বিশ্বস্ত সহযোগীদের নামে (বেনামি সম্পত্তি) রেজিস্ট্রি করেছেন। ড্রেজিং সিন্ডিকেটের এই অবৈধ টাকা ভবন নির্মাণ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর ও নগদ হিসেবে জমা রাখা হয়েছে। রাজউক ও স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বেনামি দলিল ও নকশা অনুমোদনের মূল নথিগুলো যাচাইয়ের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। নৌপথ সংশ্লিষ্টদের মতে, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগ এখন এক ‘আলাদিনের চেরাগ’। ভুক্তভোগী লঞ্চ মালিক সমিতির এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি বছর নাব্যতা সংকটে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। ড্রেজার চলে কিন্তু গভীরতা বাড়ে না—এ এক অলৌকিক রহস্য।
বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ড্রেজিং প্রকল্পটি এখন লুটপাটের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিগত তদারকি ছাড়া নদী খনন কখনোই সফল হবে না। এখানে স্বচ্ছতা আনতে হলে ডিজিটাল ড্রেজিং মনিটরিং সিস্টেম চালু করা জরুরি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর পক্ষ থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন অডিট ও উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং প্রকল্পের নথিপত্র তলব করার প্রক্রিয়া চলছে এবং মামুন উর রশিদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নদী খননের নামে এই লুণ্ঠন বন্ধ না হলে অচিরেই দেশের মানচিত্র থেকে বহু নদী বিলীন হয়ে যাবে। ড্রেজিং প্রকল্পের শত শত কোটি টাকা কেবল বালুর নিচেই চাপা পড়বে—যদি না দ্রুত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য; এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বিধায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

